• Home
  • বই
  • জীবনী
  • বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

বিশ্বনবী মুহাম্মদ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
 
যায়নুল আবেদীন রাহনুমা
 
আবু জাফর অনূদিত
 
 
 

উৎসর্গ

 
আমার জান্নাতবাসী আব্বা ও আম্মার
পবিত্র স্মৃতির উদ্দেশ্যে
- আবু জাফর

পাঠকদের প্রতি

এ গ্রন্থে মহানবী হযরত মুহাম্মদ-এর নাম পাঠকালে ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ পাঠ করা অবশ্য কর্তব্য। এছাড়া পুরুষ ও মহিলা সাহাবীগণের ক্ষেত্রে যথাক্রমে ‘রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু’ ও ‘রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা’ পড়া বিধেয়।
 

সূচি

  • প্রকাশকের কথা ---------------------------------------------
  • উপক্রমণিকা ------------------------------------------------
  • বাংলা অনুবাদকের কথা --------------------------------------
  • ইংরেজি অনুবাদকের কথা ------------------------------------
  • লেখকের নিবেদন প্রথম খণ্ড -----------------------------------
  • লেখকের নিবেদন দ্বিতীয় খণ্ড ----------------------------------
  • লেখকের নিবেদন তৃতীয় খণ্ড ----------------------------------
 

প্রথম খণ্ড

 
দৃশ্যপট - এক ঃ অনুশির্ভান-এর দরবার (Anushiravan)

 

দৃশ্যপট - দুই ঃ জাস্টিনিয়ানের দরবার ঃ আর
  • একটি জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান ---------------------------------
  • একজন বিনীত ব্যক্তির কাজ ----------------------------------
  • জমজম কূপ -----------------------------------------------
  • চোখের পানিতে মাটি ভিজে গেলো ----------------------------
  • দুঃখের মাঝে মৃদু হাসি --------------------------------------
  • ফাতিমার ভালোবাসা ----------------------------------------
  • ভাবাবেগের বেগবান সোনার অগ্নিশিখা -------------------------
  • ভাগ্য পরিবর্তন করা যায় না ----------------------------------
  • একটি অপরূপ অপচ্ছায়া ------------------------------------
  • মনের চেয়ে হৃদয় দেখে গভীরভাবে ---------------------------
  • কোথায় ছিলেন তিনি? ---------------------------------------
  • ফাতিমার দুঃখজনক ভাগ্য ------------------------------------
  • খোদা তাঁর নিজের ঘরকে রক্ষা করবেন ------------------------
  • অনুশির্ভান-এর স্বপ্ন -----------------------------------------
  • যে আলো এখনও জ্বলজ্বল করে -------------------------------
  • মরুভূমির মধ্যে --------------------------------------------
  • অন্ধকার দিগন্ত থেকে ---------------------------------------
  • অশ্র“বিন্দুর স্মৃতি -------------------------------------------
  • অপর এক বিষাদময় মানসিক ক্লেশ ----------------------------
  • বহিরার অত্যাশ্চর্য কথা --------------------------------------
  • সবার ওপর খোদার দৃষ্টি ------------------------------------
  • অন্তহীন রাত -----------------------------------------------
  • অন্ধকার থেকে উৎসারিত আলো ------------------------------
  • খাদীজা ---------------------------------------------------
  • মুহাম্মদের আকাশে একটি নতুন তারা -------------------------
  • অনুরাগ থেকে সৃষ্ট বিশ্ব -------------------------------------
  • সত্যের অনুসন্ধানে মুহাম্মদ ----------------------------------
  • মুহাম্মদ ও কুরাইশ জনগণ -----------------------------------
  • পাঠ করুন...! ---------------------------------------------
 

দ্বিতীয় খণ্ড

 
  • বেহেশত ও সীমাহীন মরুভূমির নেতা --------------------------
  • মৃদুমন্দ বায়ুর মতো যে ছায়া অপসারিত হলো -------------------
  • আল্লাহ মহান ----------------------------------------------
  • আল্লাহ আপনাকে ত্যাগ করেননি -----------------------------
  • পুরনো বিশ্বাস ও নতুন ভাবাবেগ -----------------------------
  • যুবকটির ধর্মবিশ্বাস -----------------------------------------
  • স্বপ্নের শক্তি -----------------------------------------------
  • পৌত্তলিকতা থেকে আল্লাহর ইবাদত --------------------------
  • দোযখের আগুন থেকে মুক্ত হও ------------------------------
  • মুহাম্মদ ও কুরাইশ নেতৃবৃন্দ ----------------------------------
  • আমার হাতের শক্তি লুপ্ত হয়েছে -----------------------------
  • স্ত্রীলোকটি কখনই আমাকে দেখতে পাবে না -------------------
  • প্রথম স্বদেশ ত্যাগ ---------------------------------------
  • আসমানের দিকে একবার ক্ষণিক দৃষ্টিপাত --------------------
  • আমিই এ কাজ করবো ------------------------------------
  • একজন কবির প্রয়োজন মদ ও ভালোবাসা --------------------
  • অনুরাগের মধ্যে রাগের সমাপ্তি -----------------------------
  • আল্লাহ আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন -----------------------
  • কুরাইশ নেতৃবৃন্দের চুক্তি -----------------------------------
  • একজন পাগল লোক বা একজন অলৌকিক কর্মী ---------------
  • আবিসিনিয়ার রাজার রাজসভা ------------------------------
  • ইবাদতে সবাই মাথা অবনত করলো --------------------------
  • পর্বতমালার একটি কণ্ঠস্বর ---------------------------------
  • মুহাম্মদ - আল্লাহর নবী ------------------------------------
  • তুমি যদি আমাদের মধ্য থেকে চলে যাও ---------------------
  • মহানবীর মিশনে খাদীজার অংশগ্রহণ ------------------------
  • খাদীজার শেষ চাহনিতে কী ছিলো ---------------------------
  • মুহাম্মদ-এর জীবনের দুঃখের দিনগুলো -----------------------
  • এ লোকটি সত্য পথের পথিক ------------------------------
  • নৈশভ্রমণ ও মি’রাজ --------------------------------------
  • মক্কায় ইসলামের আলো ------------------------------------
  • রাতের মাঝে --------------------------------------------
  • ভয়ে অন্তর কেঁপে গেলো -----------------------------------
  • নতুন ও পুরনো পৃথিবীর মাঝে ------------------------------
  • নবযুগের সূচনা ------------------------------------------
 

তৃতীয় খন্ড

 
  • একটি ক্ষুদ্র মরুযাত্রী দল ----------------------------------
  • দু’ধরনের সাহস ------------------------------------------
  • প্রথম পবিত্রকরণ ------------------------------------------
  • আমার গৃহ, ইবাদত ও স্থায়ী বিশ্রামের স্থান -------------------
  • ‘বলো, হে সালমান!’ ----------------------------------------
  • সালমান বললেন ---------------------------------------------
  • আয়েশা -----------------------------------------------------
  • ভ্রাতৃত্বের সন্ধি ------------------------------------------------
  • আংটি এবং তাঁর ব্যক্তিত্বের সিলমোহর --------------------------
  • একটি একক সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠা -------------------------------
  • ইহুদী সম্প্রদায়ের মাঝে --------------------------------------
  • আল্লাহর কসম, তাঁর চেয়ে উত্তম কাউকে কখনো আমি জানি নে ---
  • মুহাম্মদ-এর অস্তিত্বের দলিল গুটিয়ে ফেলি ----------------------
  • এ হাড়টি আমাদের গলায় বিধে আছে ---------------------------
  • তরবারি নয়, অশ্র“র ঝলকানি ---------------------------------
  • নবীর শহরে কী ঘটেছিলো ------------------------------------
  • পয়গম্বরী নূর সারা বিশ্বকে আলোকিত করলো -------------------
  • প্রতিশোধের স্পৃহা তাদেরকে উৎসাহিত করলো ------------------
  • মক্কার ক্ষমতার উৎস -----------------------------------------
  • চিরকালের জন্য পৌত্তলিকতাকে কবর দেওয়া হয়েছে ------------
  • চলো আমরা যাই এবং তাদেরকে দেখাই ------------------------
  • আস্থা ও সন্দেহের তুলনা --------------------------------------
  • প্রথমে যুদ্ধবন্দীদের উদ্ধার, পরে প্রতিশোধ ------------------------
  • আল্লাহ কোন্ জিনিস সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন? ----------------
  • জয় এবং পরাজয় --------------------------------------------
  • মুহাম্মদ-এর আনুগত্য ----------------------------------------
  • আয়েশার ঘটনা ----------------------------------------------
  • বিদ্যুতের ঝলকানিতে দৃষ্ট ছবি ---------------------------------
  • অদৃশ্য সৈন্যদল ----------------------------------------------
  • মুহাম্মদ-এর কাছ থেকে পারস্যের সম্রাটের কাছে -----------------
  • তোমার ওপর কে প্রভুত্ব করবে? ------------------------------
  • বিদায়ের বছর -----------------------------------------------
  • যে আলো কোনোদিন নির্বাপিত হবে না ------------------------
  • পরকাল ----------------------------------------------------
  • গ্রন্থপঞ্জি (Bibliography) -----------------------------------
 
 

প্রকাশকের কথা

‘বিশ্বনবী মুহাম্মদ (স)’ গ্রন্থখানি প্রকাশ করতে পেরে আমরা আনন্দিত এবং এজন্য আমরা আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানাচ্ছি।
 
আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (স)-এর জীবন ও সাধনা নিয়ে বাংলা ভাষায় অনেক গ্রন্থ রচিত হয়েছে। বিভিন্ন ভাষা থেকে অনেক গ্রন্থ অনূদিত হয়েছে। প্রথম প্রকাশের পর থেকে ‘বিশ্বনবী মুহাম্মদ (স)’ গ্রন্থখানি পাঠকের কাছে সমাদৃত হয়। এ গ্রন্থের ভাষা ও বর্ণনার বৈশিষ্ট্য এমন আকর্ষণীয় যা পাঠককে মোহিত করে। বাস্তবতার ছোঁয়া এ গ্রন্থের প্রতিটি পাতাতেই বিধৃত হয়েছে। গভীর পান্ডিত্য ও কল্পনাবিলাসী লেখার অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ফার্সী ভাষায় রচিত এ অমর সৃষ্টি বাংলা ভাষায় নতুন সংযোজন। তৎকালীন আরব সমাজের এক জীবন্ত বর্ণনার পাশাপাশি মরুভূমি ও পর্বতের প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে নবী মুহাম্মদ (স)-এর বেড়ে ওঠার এবং একই সাথে তাঁর ‘মিশন’ সফল হওয়ার কথা লেখক তুলে ধরেছেন ধারাবাহিকভাবে। লেখকের কথায় ঃ আপনাদের সামনে এখন যে গ্রন্থখানি রয়েছে তা হলো অন্ধকার ও আলোর ইতিহাস; এটা হলো এক দীর্ঘ রাতের কাহিনী - যা শেষ হয়েছে একটা উজ্জ্বলতম সকালের আগমনে।
 
ফার্সী ভাষার অনুভূতি প্রকাশক বাক্যবিন্যাস ও আবেগ বাংলা ভাষায় মূর্ত হয়ে উঠেছে এ অনুবাদে। সহজ ও প্রাণবন্ত বাংলায় জনাব আবু জাফর গ্রন্থখানি পাঠকদের উপহার দেওয়ার চেষ্টায় সফল হয়েছেন; এক নাগাড়ে তা শেষ করার মতো। সচেতন পাঠক উপলব্ধি করবেন, তাঁরা মুহাম্মদ (স)-এর জীবনী পড়ছেন এবং একই সাথে বিশ্বের সর্বোত্তম ব্যক্তির বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনা যেনো চোখের সামনেই প্রত্যক্ষ করছেন। অনেকে মনে করেন, এটা এক অসাধারণ সৃষ্টি। আমরাও তাই মনে করি। বিশিষ্ট লেখক ও অনুবাদক জনাব আবু জাফরকে আমরা ধন্যবাদ জানাই আন্তরিকভাবে।
 
গোলাম মোস্তফা
হাক্কানী পাবলিশার্স
মমতাজ প্লাজা, ধানমন্ডি
ঢাকা
 

উপক্রমণিকা

বহুদিন আগেকার কথা, ১৯৫৭ সাল। আমি তখন বৈরুতে ছিলাম। বৈরুতে আমেরিকান ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের অধ্যাপক নিকোলা জিয়াদে আমার দেখাশুনা করছিলেন। নিকোলা খ্রিস্টান, কিন্তু ইসলামী ইতিহাসের একজন গভীর পাঠক। আমি তেহরানে বেড়াতে যাব শুনে তিনি আমাকে তিনটি ঠিকানা দিলেন। জানালেন, এঁরা তিনজন অত্যন্ত সজ্জন এবং আমাকে প্রয়োজনে সব সাহায্য তাঁরা করবেন। এঁদের মধ্যে একজন ছিলেন আমেরিকান ফ্রেন্ডস অব দি মিডল ইস্ট-এর প্রতিনিধি। ভদ্রলোক মার্কিনী, তাঁর নাম এখন আর আমার মনে নেই। আরেকজনের নাম হচ্ছে ডক্টর শাফাক। তিনি তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের প্রফেসর ছিলেন। তৃতীয়জনের নাম ডক্টর যায়নুল আবেদীন রাহনুমা। ইনি ছিলেন ইসলামী চিন্তাবিদ এবং একজন বিখ্যাত পণ্ডিত। নিকোলা এঁদের পরিচয় জানিয়ে আমাকে বলেছিলেন, “যায়নুল আবেদীন একজন অসাধারণ ব্যক্তি। পৃথিবীর বহু ভাষায় তাঁর গ্রন্থাদি অনূদিত হয়েছে। তিনি একজন সুন্নী এবং হানাফী। ইরানের শিয়া পরিবেশের মধ্যে তিনি প্রবল প্রতাপের সঙ্গে বসবাস করছেন।”
 
আমি তেহরানে পৌঁছে তখ্ত জামশিদের ধারে একটি হোটেলে উঠেছিলাম। হোটেলটির নাম মনে নেই, পরিচ্ছন্ন একটি ছোট হোটেল। এখন এ হোটেলটি আছে কিনা জানি না। কখন পৌঁছেছিলাম মনে নেই, সম্ভবত দুপুরে। গোসল করে দুপুরের খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম নিলাম। বিকেলে ঘুম থেকে ওঠে টেলিফোনে সবার সাথে যোগাযোগ করলাম। মার্কিনী ভদ্রলোক কিছুক্ষণের মধ্যে হোটেলে আসবেন বললেন। ডক্টর শাফাক পরদিন তাঁর বাসায় আমাকে আমন্ত্রণ জানালেন সকাল ১১টায়। ডক্টর রাহনুমা পরদিন বিকেলে আমার হোটেলে আসবেন বললেন।
 
মার্কিনী ভদ্রলোক একজন গ্রন্থাগারিক। ‘মধ্যপ্রাচ্যের বন্ধুদের জন্য’ নামক যে প্রতিষ্ঠানটি আছে, তিনি তার পরিচালক। তিনি একটি গ্রন্থাগার এবং পাঠকেন্দ্র গড়ে তুলেছেন, যেখানে তেহরানের ছাত্ররা, সংবাদপত্রের লোকেরা নিয়মিত আসে এবং আমেরিকার ভূগোল, ইতিহাস, সাহিত্য, অর্থনীতি এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এসব বিষয়ে জ্ঞান লাভ করে। বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানটি উঠে গেছে। মার্কিনী ভদ্রলোক পরদিন সন্ধ্যায় তাঁর বাসায় আমাকে দাওয়াত দিলেন। তিনি অল্প সময়ের মধ্যে তাঁর কেন্দ্রের বিশিষ্টতা সম্পর্কে আলোচনা করলেন। তিনি জানালেন, তাঁর প্রতিষ্ঠানটি একটি গুরুদায়িত্ব পালন করছে। দায়িত্বটা হচ্ছে, আমেরিকার জনগণের সঙ্গে ইরানের জনগণের একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে 
তোলা।
 
ভদ্রলোক চলে যাবার পর আমি তখ্তে জামশিদের প্রশস্ত পথ দিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটলাম। এ পথটি পশ্চিমের দিকে এগিয়ে আলবুর্জ পাহাড়ের গোড়ায় এসে থেমেছে। ফেরদৌসীর ‘শাহনামা’র মধ্যে আলবুর্জ পাহাড়ের একটি রোমান্টিক বিবরণ আছে। আলবুর্জ পাহাড়ে ওঠে একটি বিরাট টানেলের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হলে কাস্পিয়ান সাগরের কাছে এসে পৌঁছানো যায়। কাস্পিয়ান সাগরের কাছে বিদেশী পর্যটকদের জন্য দুটি মনোরম জায়গা আছে - একটির নাম রামসর, অন্যটির নাম বাবুলসর। যে বছরের কথা বলছি, সে বছরে এসব জায়গায় আমি যেতে পারিনি, আরও অনেক পরে গিয়েছিলাম। কিছুক্ষণ হেঁটে হোটেলে ফিরে রাতের খাবার খেলাম। রাত দশটার দিকে রাহনুমার টেলিফোন পেলাম। তিনি আগামীকাল যে আসবেন, সে কথা আবার স্মরণ করিয়ে দিলেন।
 
পরদিন একটি ট্যাক্সি নিয়ে ডক্টর শাফাকের বাড়িতে গেলাম। নানা কথার পর তিনি তাঁর একটি পান্ডুলিপি দেখালেন ‘ইসলামী দর্শন’ নিয়ে লেখা। তিনি আল্লামা ইকবালের দার্শনিক চিন্তা সম্পর্কে বেশ সম্মানের সাথে মন্তব্য করলেন। আমি যায়নুল আবেদীন রাহনুমার নাম বলতেই তিনি তাঁর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন। বললেন, “রাহনুমা একজন বিনয়ী এবং পরিচ্ছন্ন মেজাজের লোক। তিনি ইসলাম ধর্মের মূল আদর্শ নিয়ে গবেষণা করেছেন এবং রসূলের জীবনী নিয়ে তাঁর যে গ্রন্থ, সেটা তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি দিয়েছে।”
 
শাফাকের ওখানে বেশ কিছু চকলেট খেলাম।
 
বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ডক্টর রাহনুমা এলেন। আমি আমার ঘরেই ছিলাম। টেলিফোন পেয়ে লাউঞ্জে নেমে এলাম। রাহনুমার সাথে দেখা হল। গোলগাল বেঁটে মানুষ। সমস্ত মুখে রক্তিম আভা। সুন্দর করে ছাঁটা কাঁচা-পাকা দাড়ি। পরিচয় হতেই তিনি আমার হাত ধরে পেছনে বাগানে নেমে এলেন। বাগানে গাছ-গাছড়া এবং ফুলের কেওয়াড়ির কাছে টেবিল-চেয়ার সাজানো আছে। এরকম একটি টেবিলের দু’পাশের দুটি চেয়ারে আমরা বসলাম। যায়নুল আবেদীনের হাতে তাঁর লেখা একটি বই ছিলো। বইটির নাম ‘পয়াম্বর’। বইটি তিনি আমাকে উপহার দিলেন। আমার নাম লিখতে গিয়ে ভুল করে ‘আহসান আলী’ লিখে ফেললেন। আমি ভুল দেখিয়ে দিলে তিনি হেসে বললেন, “ভুলই থাক, তাহলে আমার কথা স্মরণ হবে।” রাহনুমা বললেন, “যে কোন মুসলমান সাহিত্যিকের কর্তব্য হচ্ছে রসূলের জীবনী নিয়ে আলোচনা করা এবং অন্তত পয়গম্বরের জীবনীভিত্তিক একটি গ্রন্থ রচনা করা। তাহলেই দেখবেন, আপনি স্বস্তি পাচ্ছেন এবং সাহিত্য কর্মে এগিয়ে যেতে সফলকাম হচ্ছেন। আমি ‘পয়াম্বর’ বইটি লেখার পর খুব শান্তি এবং স্বস্তি অনুভব করেছি। আমি আধুনিক যুক্তিবাদী মানুষ, কিন্তু রসূলের জীবন কথা লিখতে গিয়ে আমি আবেগে চঞ্চল হয়েছি, মনে হয়েছে আমি যেন অলৌকিকের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছি। পৃথিবীতে কত মহাপুরুষ এসেছেন এবং চলে গেছেন, কিন্তু রসূলে খোদা এমন একজন পুরুষ যাঁর নাম উচ্চারণের সাথে সাথে গাছের পাতা সবুজ হয়ে কেঁপে ওঠে, বাতাস প্রবাহিত হয় পৃথিবীর এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে এবং একটি স্নিগ্ধ বরাভয়ে মানুষ আশ্বস্ত হয়।” রাহনুমা কথা বলছিলেন। তাঁর মুখ যেন আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে উঠছিল। কথাবার্তা শেষে রাহনুমা আমাকে নিয়ে বেরুলেন। বললেন, “চলুন আমার গাড়িতে করে শহরের কিছুটা দেখে আসি।” আমি তাঁর সাথে তাঁর গাড়িতে করে আলবুর্জ পাহাড়ের সানুদেশে একটি ঝর্ণার কাছে গিয়ে বসলাম। আজও মনে হয়, এই তো সেদিন মাত্র। কিন্তু ইতোমধ্যে চল্লিশ বছর পার হয়ে গেছে। রাহনুমার সাথে আর দেখা হয়নি। ১৯৬৭ সালে আবার আমি ইরানে গিয়েছিলাম। তখন রাহনুমার এক কন্যার সাথে দেখা হয়েছিল। তিনিও তখন বেশ প্রৌঢ়া। ইরানী কবি তাহেরেহ সফরজাদেহ বছর দশেক আগে ঢাকায় এসেছিলেন। তাঁর কাছে আমি রাহনুমার খবর পাই। তিনি তখন অসুস্থ এবং শয্যাশায়ী। তাঁকে আর পাওয়া যাবে না, কিন্তু তাঁর ‘পয়াম্বর’ গ্রন্থটির বাংলা অনুবাদ চিরদিন তাঁর বিশ্বাস এবং আগ্রহের কাছে আমাদেরকে নিয়ে আসবে।
 
সৈয়দ আলী আহসান
৬০/১ উত্তর ধানমন্ডি, ঢাকা-১২০৫
১.৬.৯৮
 
 
 
সৈয়দ আলী আহসানকে প্রদত্ত পুস্তকে লেখকের স্বাক্ষর
 
 

বাংলা অনুবাদকের কথা

ফার্সী ভাষায় যায়নুল আবেদীন রাহনুমা রচিত ‘পয়াম্বর’ গ্রন্থখানি ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করেন L. P Elwell-Sutton "Payamber : The Messenger" নাম দিয়ে। এ ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয় ১৯৬৪ সালে, তিন খণ্ডে। ফার্সী ভাষায় রচিত ওই গ্রন্থের প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয় ১৯৩৭ সালে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড দু’টি প্রকাশিত হয় যথাক্রমে ১৯৫৩ এবং ১৯৫৬ সালে।
 
 
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স) -এর জন্ম-পূর্ববর্তী সামাজিক ও ধর্মীয় অবস্থা, রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের অবস্থা এবং এরই প্রেক্ষাপটে তাঁর জন্ম ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা, অতঃপর নবুয়ত লাভের ঘটনা থেকে শুরু করে তাঁর 
ইন্তেকাল পর্যন্ত সময়কালের ঘটনাবলী এ পুস্তকে সন্নিবেশিত হয়েছে। মহানবীর জীবনের যেসব ছোটখাট ঘটনা ইতিহাসে উপেক্ষিত হয়ে আছে, লেখকের সূক্ষ্ম দৃষ্টি থেকে সেসব ঘটনা বাদ পড়েনি। অতি যতেœর সাথে তিনি সেসব ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন সাবলীলভাবে। এতে অনেক অনুদঘাটিত তথ্য উদঘাটিত, অনেক অজানা কথা জানা সম্ভব হয়েছে।
 
ইংরেজিতে অনূদিত গ্রন্থখানি তিন খণ্ডে সমাপ্ত। ১৯৮৪ ও ১৯৮৮ সালে এর দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড পৃথকভাবে বাংলায় প্রকাশিত হয়। ওই দুই খণ্ড একত্রে ‘বিশ্বনবী মুহাম্মদ (স)’ শিরোনামে প্রকাশিত হয় ১৯৯৮ সালে। ইংরেজিতে প্রকাশিত তিন খণ্ডের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ একই শিরোনামে প্রকাশিত হয় ২০০০ সালে।
 
ওই সময় বিশিষ্ট গবেষক ড: আবদুল ওয়াহিদ ‘আল-আমীন প্রকাশন’ থেকে গ্রন্থখানি প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। গ্রন্থখানির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হলো হাক্কানী পাবলিশার্স থেকে, এর সত্বাধিকারী জনাব গোলাম মোস্তফার উদ্যোগে। গ্রন্থখানি প্রকাশের জন্য আমি তাঁকে ধন্যবাদ জানাই।
 
মহানবীর জীবনের ওপর লিখিত জগদ্বিখ্যাত এ গ্রন্থের বঙ্গানুবাদ করার সুযোগ পেয়ে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি। পাঠকগণের কাছে বইখানি আগের মতো এবারও সমাদৃত হলে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করবো।
 
আবু জাফর
২ এইচ ইস্টার্ন হাউজিং এপার্টমেন্ট
৩৭ পাইওনিয়ার রোড, কাকরাইল, ঢাকা
০৮ সেপ্টেম্বর, ২০০৮
 
 
 

ইংরেজি অনুবাদকের কথা

সৈয়দ আমীর আলীর ‘দি স্পিরিট অব ইসলাম’ ১৮৯০ সালে প্রথম প্রকাশিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত পশ্চিমা বিশ্ব একজন মুসলমান লেখকের দৃষ্টিতে আরবের মহান নবীর জীবনী পড়ার সুযোগ পায়নি। ইরানে একজন বিশিষ্ট লেখকের এ অসাধারণ জীবনীগ্রন্থ ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করার জন্য অবশ্য কোনো কৈফিয়ত দেওয়ার প্রয়োজন নেই। এ পুস্তকখানি ইরানে ইতোমধ্যে সতেরতম সংস্করণ প্রকাশিত হয়। এছাড়া ফরাসি ভাষায়ও গ্রন্থটি অনূদিত হয়েছে। অমুসলিম পাঠকদের জন্য এ পুস্তকের একটা বাড়তি আকর্ষণ আছে; পুস্তকখানি লেখা হয়েছিলো মূলত মুসলিম পাঠকদের লক্ষ্য করে। ফলে সৈয়দ আমীর আলীর পুস্তকের মতো এ পুস্তকখানি কোনোভাবেই বিধর্মীদের লক্ষ্য করে প্রচারমূলক বা ধর্ম প্রচারের জন্য লেখা হয়নি।
 
জনাব রাহনুমা কিছুটা বিস্তৃতভাবে তাঁর নিজের লেখা ভূমিকায় এ পুস্তক লেখার পটভূমি ব্যাখ্যা করেন। তিনি কি উদ্দেশ্য অর্জন করতে আশা করেন, তাও লিখেছেন। লেখকের পরিচয় তুলে ধরার কাজ আমারই।
 
জনাব যায়নুল আবেদীন রাহনুমা হলেন ইরানের একজন বিশিষ্ট খ্যাতনামা ব্যক্তিত্ব। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সংস্কৃতি সম্পর্কে তিনি ছিলেন অগাধ পান্ডিত্যের অধিকারী। চল্লিশ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি সাংবাদিকতা ও প্রকাশনার সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। ১৯১৬ সালে প্রকাশনার শুরু থেকে তিনি দৈনিক সংবাদপত্র ‘ইরান’-এর সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ১৯২১ সালে তিনি এ পত্রিকার মালিক হন। এ পত্রিকার মালিক হওয়ার  পর তাঁর প্রথম একটি কাজ ছিলো, স্বাধীনভাবে পত্রিকা প্রকাশের উদ্দেশ্যে সরকারের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা। স্পষ্ট কথা বলার জন্য ১৯৩৫ সালে তাঁকে ইরান ত্যাগে বাধ্য করা হয় এবং পত্রিকা পরিচালনার ভার অন্যের ওপর অর্পণ করা হয়। অবশ্য মরহুম রেজা শাহ এর সিংহাসন ত্যাগের পর ১৯৪১ সালে তিনি ইরানে ফিরে এসে পত্রিকার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর সুযোগ্য পরিচালনায় ‘ইরান’ তেহরান ও ইরানে প্রধান দৈনিক পত্রিকার মর্যাদা অর্জন করে। ওই সময় থেকে জনাব রাহনুমা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪২ সালে উপ-প্রধানমন্ত্রী, ১৯৪৫ সালে প্যারিসে ইরানী মন্ত্রী এবং ১৯৪৬ সালে সিরিয়া, লেবানন ও ট্রান্স-জর্দান-এ ইরানী মন্ত্রী হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। কয়েক বছর ধরে তিনি মজলিস বা আইন পরিষদের নিম্নকক্ষের ডেপুটি এবং সিনেটর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
 
জনাব রাহনুমা তাঁর নিজের লেখা ভূমিকায় উল্লেখ করেন, নবী মুহাম্মদ-এর জীবনীগ্রন্থ লেখার কাজ শুরু হয় বিদেশে তাঁর নির্বাসনের দিনগুলোতে। ১৯৩৭ সালে এর প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয় দামেস্ক-এ, ১৯৫৩ সালে দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশিত হয় তেহরানে এবং তৃতীয় খণ্ডও প্রকাশিত হয় তেহরানে, ১৯৫৬ সালে। তাঁর এ অসাধারণ কাজকে বলা যায় গভীর পাণ্ডিত্য ও কল্পনাবিলাসী লেখার অপূর্ব সমন্বয়। তাঁর এ পুস্তকে যেসব ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে, তা সেই সময়কার স্বীকৃত ঘটনাপঞ্জি লেখকদের বর্ণনায় সমর্থন রয়েছে। এতদসত্ত্বেও তাঁর এ অমর সৃষ্টি শুধু ইতিহাসের নিরস বর্ণনা বা ঘটনার উল্লেখ থেকে অনেক দূরে। সত্য ঘটনার কাঠামোর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত থেকে জনাব রাহনুমা আমাদের এক মুগ্ধকর ঐতিহাসিক ঘটনা উপহার দিয়েছেন; একজন কবি, দার্শনিক ও অতীন্দ্রিয়বাদীর দৃষ্টিতে তিনি তের শতাব্দীর (বর্তমানে চৌদ্দ শতাব্দী) পূর্বেকার আরবের জীবন ও কালের জীবন্ত এবং স্পষ্ট বর্ণনা করেছেন, মরুভূমি ও পর্বতের প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রেক্ষাপটে নবী মুহাম্মদ-এর বেড়ে ওঠার কথা বলেছেন। বলেছেন ওই শিশুটির কথা, যে যৌবনে পদার্পণ করেছে; লিখেছেন ওই লোকটির কথা, যিনি নবী হয়েছেন। সেই সমাজের চিত্র এঁকেছেন, যে সমাজ কখনো মার্জিত রুচিসম্পন্ন, কখনো বা আদিম অথবা পুরাতন। তবে সেই সমাজ যে নিষ্ঠুর তার বহিঃপ্রকাশ ঘটতো প্রায় সব সময়। যুবক ওই লোকটিকে কিভাবে ওই সমাজ গঠন করেছে, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দিক থেকে ওই সমাজ তাঁর ওপর কিভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে তার বর্ণনা তিনি করেছেন বিস্তারিতভাবে। বলেছেন ওই যুবক লোকটির উপদেশের কথা যা একদিন মানব সমাজের আট ভাগের এক ভাগ লোককে পরিচালিত ও পথ প্রদর্শন করেছে। শুধু তাই নয়, ওই সময় ও পরিবেশে বসবাসরত একজন মানুষের যেসব দৃশ্য ও ঘটনা প্রতিভাত হয়েছে তাও লেখক তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তিনি তাঁর বর্ণিত ঘটনাকে সুশোভিত ও আকর্ষণীয় করতে সহায়ক ঐতিহ্যগত কাহিনী ও উপকথাকেও অবজ্ঞা করেননি। অমুসলিম এবং বিশেষ করে খ্রিস্টান পাঠকরা হয়তো এমন সব ঘটনা ও কাহিনীর কথা পড়ে হতবুদ্ধি হয়ে যেতে পারেন, যার সাথে হিব্র“ ও খ্রিস্টান লেখকদের লেখায় বিধৃত ঘটনা ও কাহিনী - যার সাথে তারা পরিচিতÑ তার কোনো মিল নেই। তাঁরা হয়তো ওই সব ঘটনা ও কাহিনীর কথা পড়ে প্রশংসা করবেন এ জন্য যে, ওই সব ঘটনা ও কাহিনী ইসলামী ঐতিহ্যের কাছে পরিচিত এবং স্বীকৃত, আর পাশ্চাত্যের লোকদের কাছে পরিচিত সেইসব ঘটনা নবীর জীবনের সাথেও বৈধভাবে সম্পৃক্ত হয়ে আছে। কারণ, জনাব রাহনুমা নিজেই প্রায় সময় বলেছেন, একমাত্র আল্লাহই সত্য সম্পর্কে অবগত আছেন।
 
বর্তমান বিশ্বে মুসলমানদের সংখ্যা তিন বা চারশ মিলিয়ন (এ সংখ্যা এখন আরও বৃদ্ধি পেয়েছে)। পশ্চিমে মরোক্কো থেকে পূর্বে ইন্দোনেশিয়া এবং উত্তরে কাজাখস্তান থেকে দক্ষিণে সেন্ট্রাল আফ্রিকা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে মুসলমানদের বসবাস। এছাড়া সমগ্র বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার মুসলমান রয়েছে। আজকাল সুদূরপ্রসারী এ ধর্মকে জানার জন্য যে চেতনা সবাইকে অনুপ্রাণিত করে, সে সম্পর্কে জ্ঞান লাভের জন্য কাউকে বিশেষ চেষ্টা করতে হয় না; এবং ওই বিষয়ে জনাব রাহনুমার বোধগম্য, প্রাণবন্ত, এমনকি সরসতাপূর্ণ জীবনী গ্রন্থের চেয়ে উত্তম আর কিছু হয় না।
 
অনুবাদ (ইংরেজি) সম্পর্কে একটা সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন। কুরআন থেকে গৃহীত উদ্ধৃতি নেওয়া হয়েছে মার্মাডিউক পিকথলের ‘দি মিনিং অব দি গ্লোরিয়াস কুরআন’ থেকে; জালালুদ্দীন রূমীর কবিতার উদ্ধৃতি নেওয়া হয়েছে (দু’-একটা কবিতা ব্যতীত) আর. এ. নিকলসনের ‘দি মসনবী অব জালালুদ্দীন রূমী’ এবং ‘সিলেক্টেড পোয়েমস ফ্রম দি দিওয়ান-ই শাম্স-ই-তাবরীজ’ থেকে। ‘দৃশ্য দুই : জাস্টিনিয়ানের দরবার’ অধ্যায়ের কয়েকটি ভাষণ সরাসরি গ্রহণ করা হয়েছে গীবনের ‘ডিক্লাইন এ্যান্ড ফল অব দি রোমান এম্পায়ার’ গ্রন্থ থেকে, ওই উদ্ধৃতিগুলো লেখক প্রথমে ওই গ্রন্থ থেকেই ফার্সী ভাষায় অনুবাদ করেন। লেখকের সূত্রের গ্রন্থতালিকা দেওয়া হয়েছে পুস্তকের শেষে।
 
এল. পি. এলওয়েল সাটন
 

লেখকের নিবেদন

প্রথম খণ্ড

 
‘আপনি বলুন (অবিশ্বাসীদেরকে, হে মুহাম্মদ!) :
আমি  তোমাদেরকে একথা বলি না যে, আমার
কাছে আল্লাহর ধনভাণ্ডার আছে বা আমি অদৃশ্য
বিষয় সম্বন্ধে অবগত; এবং আমি তোমাদের
একথাও বলি না, দেখো, আমি একজন ফেরেশতা।
আমি শুধু সেই ওহীর অনুসরণ করি যা আমার
ওপর নাযিল হয়। আপনি বলুন : অন্ধ ও চক্ষুষ্মান
ব্যক্তি কি সমান? তোমরা কি তবু ভেবে দেখবে
না?’
- কুরআন ৬ : ৫০
 
আমি যখন তেহরান ত্যাগ করি, তখন আমি ক্লান্ত ছিলাম; ক্লান্ত ছিলাম দৈহিক ও মানসিকভাবে। অন্য কোনো কাজে না থেকে পনের বছর ধরে শুধুমাত্র পত্রিকা সম্পাদনা এবং সাংবাদিকতা করা ও এর উত্থান-পতনের সাথে জড়িত থাকা নিঃসন্দেহে ক্লান্তিকর। এ কারণে এবং তৎকালীন সরকারের হস্তক্ষেপের কারণে আমি আমার পত্রিকা ‘ইরান’ ত্যাগ করি। এ সংবাদপত্রের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য আমি কঠোর পরিশ্রম করি। আমার আশা ছিলো, এ পত্রিকাকে আমি দেশের একটি শ্রেষ্ঠ সংবাদপত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠত করবো। আমার ওই সময়টা ছিলো দেশ থেকে দূরে কয়েকটা বছর কাটিয়ে দেওয়ার, আমার সাথে থাকবে কেবল আমার চিন্তা ও অনুভূতি। সেই চিন্তা ও অনুভূতি হবে বাতাসের মতো স্বাধীন, যা পাঠকের চেতনায় কিছুটা আধ্যাত্মিক উজ্জ্বলতা দান করবে এবং যা মানুষের হৃদয় ও আত্মার সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলবে। আমার ভ্রমণশীল এ ক্ষণস্থায়ী জীবনের আবেগপ্রবণতায় তা এনে দেবে কিছুটা বিশ্রাম ও প্রশান্তি। ওই চিন্তা-চেতনা যা অন্যভাবে করা যেতো না এবং যা একজন মানুষের বহু বছরের শ্রমসাধ্য জীবনকে আঘাত করতে পারতো না তা তার অস্তিত্ব ও সামগ্রিক কাঠামোর ভিত্তিকে আকস্মিকভাবে ধ্বংস করতে পারে না। এ সম্পর্কে অবশ্য যথেষ্ট বলা হয়েছে। রাজনীতিকে আমরা রাজনীতিবিদদের কাছে ছেড়ে দিয়েছি এবং আমরা আশ্রয় নিয়েছি দূরবর্তী এক স্থানে। কিন্তু আমাদের প্রিয় দেশের জন্য আমাদের অন্তরে রয়েছে গভীর ভালোবাসা এবং তা সযতেœ সংরক্ষণ করে রেখেছি সেদিনের জন্য, যেদিন নিয়তি নিজেই সত্য প্রকাশ করে দেবে এবং অত্যাচারী শক্তিকে ধ্বংস করে দেবে।
 
সংক্ষেপে বলতে গেলে বলতে হয়, আমি যখন তেহরান ত্যাগ করি তখন এমন একটা বিষয়ের ওপর লিখতে আগ্রহী হই, যার সাথে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। দীর্ঘদিন ধরে নবীর জীবন আমাকে বিমোহিত করে রাখে এবং সে কারণে আমি ওই বিষয়ের ওপরই লিখতে শুরু করি। আপনাদের সামনে এখন যে পুস্তকখানি রয়েছে তা হলো অন্ধকার ও আলোর ইতিহাস; এটা হলো একটা দীর্ঘ রাতের কাহিনী, যা শেষ হয়েছে একটা উজ্জ্বলতম সকালের আগমনে। এটা এমন একজন লোকের জীবনকথা যার ওপর একটা জাহাজ নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিলো। সেই জাহাজের পাটাতনে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লক্ষ লক্ষ মানুষ নিয়তির সাগরের ঝটিকাসংকুল ঢেউ-এর মাঝে বাহিত হচ্ছে। ওই জাহাজটি এখনও আমাদের চোখের সামনে দিয়ে সাগর পাড়ি দিচ্ছে, তার পতাকায় রয়েছে আত্মসম্ভ্রমযুক্ত কয়েকটি শব্দ ঃ ‘আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ তাঁর নবী।’
 
প্রত্যেকেই মুহাম্মদ-এর নাম শুনেছে এবং সামান্য কিছু হলেও তাঁর ধর্ম ইসলাম সম্বন্ধে সে জানে। মানবজাতির মধ্যে লক্ষ লক্ষ লোক তাঁর জীবনী পুস্তক পাঠ করেছেন এবং তাঁর কথা থেকে কম বেশি ধারণা সবাই লাভ করেছেন। কেউ তাঁকে প্রশাসক হিসেবে দেখে, আবার কেউ তাঁকে সমালোচনা করে; সবাই কামনা করে এমন এক সামগ্রিক পুস্তক যা তাঁর সমসাময়িক কালকে সত্যিকারভাবে চিত্রিত করতে পারে। সেই পুস্তকে বর্ণিত হবে তাঁর সমাজের কথা, সেই সময়ের লোকদের পোশাক পরার ধরন, অভ্যাস, চিন্তাধারা ও তাদের সামাজিক শ্রেণী বিন্যাস; সেই পুস্তকে চিত্রিত হবে যুদ্ধ ও শান্তির সময়ে তাদের অবস্থান, বিয়ে ও অন্যান্য অনুষ্ঠানের কথা। বর্ণিত হবে যুবক, বৃদ্ধ - সবার কথা। সেই সময়ে বিশ্ব কেমন ছিলো এবং কাদের দ্বারা সেই বিশ্ব শাসিত হচ্ছিলো? সে সময় মক্কা কেমন জায়গা ছিলো, কারা তার অধিবাসী ছিলো, তাদের পেশা কি ছিলো, তাদের নৈতিক আচার-ব্যবহার, ধর্মবিশ্বাস ও আদর্শই বা কি ছিলো? তারা কিভাবে জীবনযাপন করতো এবং কোন্ ধরনের আইন ও প্রথা তারা অনুসরণ করতো তাদের কার্য পরিচালনায়? কোন্ সব বিষয়ের দিকে তারা তাদের চিন্তাধারাকে পরিচালিত করতো? তাদের সাহিত্যের স্বরূপই বা কেমন ছিলো? তাদের পুরুষ ও মহিলারা কেমন ছিলো, তাদের ভালোবাসা, তাদের প্রবাদ? তাদের বিজ্ঞতাই বা কেমন ছিলো?
 
একটি পুস্তকে এসব বিষয় একত্রিত করে গল্প বা কাহিনী নয়, সাক্ষ্যপ্রমাণসহ তাদের জীবনকে চিত্রিত করার জন্য প্রয়োজন ব্যাপক অধ্যয়নের এবং অনেক পুস্তকের সহায়তা।
 
আমরা যদি কোনো যুগের জীবনধারাকে আমাদের দৃষ্টির সামনে দৃশ্যপট, ঘটনাবলী ও জনগণকে অবিকল অবস্থায় উপস্থাপন করতে চাই তাহলে সেই যুগের একাংশের ইতিহাস পড়াই যথেষ্ট নয়। আমাদের অবশ্যই আলোচনা করতে হবে তাদের চিন্তাধারা, তাদের প্রথা, তাদের ব্যবসায়িক আদান-প্রদান, তাদের যৌন জীবন ও তাদের সাহিত্য Ñ সংক্ষেপে, তাদের সামগ্রিক জীবনধারা - একজন ইতিহাস-লেখকের অনুসৃত পদ্ধতিতে নয়, ওই সময়কার ঘটনাগুলো যে দৃষ্টিতে দেখা হতো, সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে। এরপর বিভিন্ন অধ্যায় এমনভাবে বিন্যাস করতে হবে যেনো পাঠকরা সবকিছু তার নিজের স্থানে দেখতে পান এবং যে যুগ নিয়ে তিনি অধ্যয়ন করছেন তা পর্যবেক্ষণ ও তার বিচার করতে পারেন।
 
একটি পুস্তক হলো বর্ণমালার বিভিন্ন বর্ণের সমাহার, এছাড়া আর কিছু নয়। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা এসব বর্ণকে শব্দে বিন্যাস না করি, শব্দগুলোকে বাক্যে বিন্যাস না করি এবং বাক্যগুলোকে যথাস্থানে বিন্যাস না করি, ততক্ষণ পর্যন্ত তা পুস্তক হিসেবে গণ্য হয় না।
 
একটা যুগের ইতিহাসেরও বর্ণমালা আছে। এ বর্ণমালা হলো সেই যুগের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ - পুরুষ, মহিলা, ধনী, গরীব, শাসক ও শাসিত। এরপর আছে তাদের চিন্তাধারা ও ধর্মবিশ্বাস, তাদের পেশা, তাদের ভালোবাসা ও ভাবাবেগ, তাদের কুসংস্কার ও উপকথা, তাদের গর্ব ও নম্রতা এবং আরও আছে সব রকমের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উপাদান। এ সবকিছুই প্রাসঙ্গিকভাবে তাদের নিজ নিজ স্থানে স্থাপন করতে হবে ওই সমাজকে একটা নতুন জীবন দান করার জন্য। এক্ষেত্রে যদি কোনোভাবে সামান্যতম ঘাটতি পড়ে বা কোনোভাবে বাড়তি কিছু এসে যায়, তাহলে সেই সমাজের চিত্র নির্ভরযোগ্য হবে না; তা হবে শুধুমাত্র কল্পনার চিত্র।
 
সমাজের ওই নির্ভরযোগ্য চিত্র চিত্রিত হওয়ার পর আলোচনার বিষয় সেই ব্যক্তিত্বের উত্থান সম্পর্কিত সঠিক বিবরণ লিপিবদ্ধ করতে হবে। এ অংশেও সেই ব্যক্তিত্বের বাহ্যিক আত্মপ্রকাশ থেকে শুরু করে তাঁর আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গিকেও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
 
এ পুস্তকে যতদূর সম্ভব ওই সময়কার নির্ভরযোগ্য চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, বর্ণনা করা হয়েছে মুহাম্মদ-এর জীবনের বিস্তারিত বিবরণ। যেসব ঘটনার প্রেক্ষাপটে তাঁর জন্ম হয়, সেসব ঘটনা থেকে তাঁর ‘মিশন’-এর দিন পর্যন্ত এবং তাঁর ‘মিশন’কে দূরের ও কাছের যেসব উপাদান প্রভাবিত করে, এবং তিনি তাঁর পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকে যে পরিচালনা-শক্তি অনুভব করেন এবং অতি-প্রাকৃত সূত্র থেকে তিনি যে অনুপ্রেরণা লাভ করেন, তা-ও অবিকল এবং যথার্থভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে এ পুস্তকে। মরুভূমিতে তাঁর শিক্ষা, বিদেশ ভূমিতে তাঁর পর্যবেক্ষণ, যুদ্ধ সম্পর্কে তাঁর অনুধ্যান, আরব জনগণের প্রথা, মাতার মৃত্যুতে তাঁর প্রাপ্ত মানসিক আঘাত, তাঁর ব্যক্তিগত জীবন এবং স্বীয় প্রতিভার পূর্ণতার জন্য তিনি নিজেকে যে প্রশিক্ষণ দেন, তার কথা এ পুস্তকে বলা হয়েছে সঠিকভাবে। খাদীজার সাথে তাঁর বিয়ে, জনগণের সাথে তাঁর সম্পর্ক ও আচরণ, তাঁর মিশন শুরু হওয়ার পূর্বে মক্কার লোকদের যে ধর্মবিশ্বাস তিনি প্রত্যক্ষ করেন, নিকটবর্তী পর্বতে তাঁর রহস্যপূর্ণ ভ্রমণ এবং সেখানে দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ এবং মাসের পর মাস অবস্থান - এসব এ পুস্তকে বিস্তারিত ও অবিকলভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
 
এ পুস্তকে যেসব তথ্য দেওয়া হয়েছে তার পুরোটাই নেওয়া হয়েছে সবচেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য আরবী ভাষায় লিখিত পুস্তক ও ঐতিহাসিক সূত্র থেকে - এসব সূত্র পাশ্চাত্যের ঐতিহাসিকগণও নির্ভরযোগ্য বলে মনে করেন। নবীর কথোপকথন ও বাণী নেওয়া হয়েছে হয় কুরআন, আর না হয় হাদীস থেকে - হাদীস গ্রহণ করা হয়েছে নবীর জীবনীর ওপর সর্বোত্তমভাবে লিখিত পূর্ণাঙ্গ পুস্তক থেকে। এ পুস্তকে যেসব ব্যক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে তারা সবাই ঐতিহাসিক এবং তাদের জীবনের বিস্তারিত বিবরণ অবিকলভাবে নেওয়া হয়েছে বিশ্বস্ত সূত্র থেকে। এমনকি এ পুস্তকে যেসব সাহিত্যিক বাক্যধারা প্রকাশ করা হয়েছে তাও তৎকালীন যুগ ও পরিবেশের সাথে যতদূর সম্ভব সম্পর্কিত। যেমন, যখন কোনো উট, ঘোড়া, ঝরণা বা রাতের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তখন সেই বর্ণনা নেওয়া হয়েছে ইসলামপূর্ব অথবা ইসলামের প্রাথমিক যুগের কোনো প্রসিদ্ধ কবিতা থেকে।
 
এ পুস্তকে আছে ইতিহাস, আছে লৌকিক কাহিনী। যেখানে লৌকিক কাহিনী উল্লেখ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়েছে, সেখানে তা উল্লেখ করে ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে তার পার্থক্য দেখানো হয়েছে এবং বলা হয়েছে ‘একমাত্র আল্লাহই সত্য সম্পর্কে অবগত আছেন।’
 
লৌকিক কাহিনী সম্পর্কে কয়েকটি কথা এখানে বলা হলো ।
 
লৌকিক কাহিনী হলো ইতিহাসের ছায়া। অনেক সময় আমরা ইতিহাসের চেয়ে অনেক বেশি লৌকিক কাহিনী থেকে জানতে পারি। লৌকিক কাহিনী থেকে আমরা জনগণের চেতনা, হৃদয় ও চিন্তাধারার অন্তর্নিহিত বিষয়গুলো জানতে পারি, অথচ ইতিহাস থেকে আমরা কেবল জানতে পারি জনগণের বাহ্যিক দিকগুলো। আমরা বলি যে, লৌকিক কাহিনী হলো ইতিহাসের ছায়া। কিন্তু বিষয়টা যদি আমরা একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাই যে, ছায়ার চেয়ে তা আরও একটু বেশি। লৌকিক কাহিনী হলো একটা জাতির আত্মার ছায়া, যার মধ্যে সুস্পষ্টভাবে উদ্ভাসিত হয় ওই আত্মার যৌক্তিক ক্ষমতা ও বুদ্ধিমত্তা। 
 
অথচ ইতিহাস হলো তার বিষয় ও কার্যাবলীর ত্র“টিপূর্ণ ছায়া। জনগণের হৃদয় ও কল্পনার কথা লৌকিক কাহিনী আমাদের কাছে উদ্ভাসিত করে, ইতিহাস আমাদের বলে জনগণের শুধু কাজের কথা।
 
‘লৌকিক কাহিনী’ অর্থাৎ ‘লিজেন্ড’ শব্দটার ব্যবহার হয় দু’ভাবে। যেসব লোক নিজেদের স্বর্গের সাথে সম্পর্কিত বলে দাবি করে না তাদের ক্ষেত্রে ওই শব্দটি লৌকিক কাহিনী হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। কিন্তু ওই শব্দটি যদি নবী ও ধার্মিক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, তাহলে মিরাকল বা ‘অলৌকিক ঘটনা’ কথাটা ব্যবহার করাই উত্তম।
 
অলৌকিক ঘটনা কী?
 
অলৌকিক ঘটনা এমন কিছু যা সাধারণ ঘটনার চেয়ে উঁচু স্তরের। বিষয়টি যদি আমরা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি তাহলে বলতে পারি, সেসব কাজকে ‘অলৌকিক ঘটনা’ বলা যায় যা আল্লাহ কারও জন্য সম্ভব করেছেনÑ সে কাজ সম্পাদন করা সবার জন্য সম্ভব নয়। আল্লাহ যে লোকের জন্য ‘অলৌকিক’ কাজ সম্ভব করেছেন, সেই লোককে আমরা বলি নবী। বিষয়টি যদি আমরা মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টি দিয়ে দেখি, তাহলে সেসব কাজকে আমরা বলতে পারি অসাধারণ কাজ। আর এসব অসাধারণ কাজের উৎসমূল হলো সেসব মহৎ ব্যক্তির মানসিক ও আধ্যাত্মিক অবস্থা, যাদেরকে আমরা বলি প্রতিভাবান ব্যক্তি।
 
অতুলনীয় সাহস, আল্লাহর প্রতি অতুলনীয় ভক্তি, অতুলনীয় ধর্মবিশ্বাস ও অঙ্গীকার, হৃদয় ও চিন্তার অতুলনীয় পবিত্রতা - এসব হলো অসাধারণ সেই গুণের অংশ যা খুব কম লোকই অর্জন করতে পারে।
 
কেন এমন হয়?
 
এর অনেকগুলো দিক আছে, যা ভূমিকার এ ক্ষুদ্র পরিসরে আলোচনা করা সম্ভব নয়। বিষয়টি আমরা মাটির একটু কাছাকাছি নিয়ে আসি এবং সেসব প্রতিভাবান ব্যক্তি সম্পর্কে কথা বলি, যাঁরা স্বর্গের সাথে সম্পর্কিত বলে দাবি করেননি।
 
সক্রেটিসের স্থিরসংকল্প কথা ও আচরণ, লিওনার্দো দা ভিন্সির সুদূর বিস্তৃত মেধা, শেক্সপীয়ারের সাহিত্যকর্ম, এবং সর্বোপরি তাঁর হেমলেট, ভিকটর হিউগো এবং তাঁর কল্পনাশক্তি ও বাস্তবতাবোধের শক্তি, বিথোভেন ও তাঁর নবম সিম্ফনী, যার মাধ্যমে তিনি তাঁর সুখের এবং মানবজাতির জন্য তাঁর ভালোবাসার প্রকাশ ঘটিয়েছেন - সাহিত্য বা শৈল্পিক নৈপুণ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে এসব অসাধারণ।
 
আবার ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিভিন্ন ধর্মের মহৎ ব্যক্তিগণের গুণাবলী এবং বৈশিষ্ট্যসমূহ অতুলনীয়। সাধারণভাবে তাঁদের আবির্ভাব ঘটে ক্ষমতাবানদের স্বেচ্ছাচার, অন্যায়কারীদের অত্যাচার, শাসক শ্রেণীর নৈতিক অবনতির বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ হিসেবে। সমসাময়িক লোকদের আক্রমণের বিরুদ্ধে তাঁদের প্রতিরোধ এবং স্বর্গীয় উদ্দেশ্য সাধনে তাঁদের আত্মত্যাগ তুলনাহীন, আর সাধারণ মানুষের পক্ষে তা ধারনার অতীত। ধার্মিক ব্যক্তিগণের জীবনী ও ইতিহাস লেখার সময় ঐতিহাসিকগণ তাঁদের (ধার্মিক ব্যক্তিগণের) অতিপ্রাকৃত বা অলৌকিক কাজের বিবরণ উল্লেখ না করার জন্য তাঁদেরকে ভুলের অপরাধে অপরাধী করা হয়। তাই অলৌকিক কাজকে বস্তুবাদীরা বলেন লৌকিক কাহিনী, আর বিশ্বাসীদের দৃষ্টিতে তা হলো অলৌকিক ঘটনা। কোনো অসাধারণ ব্যক্তির কাহিনী লেখার সময় আমাদের অবশ্যই তাঁর অসাধারণ কাজের মধ্যকার একটি অংশের উল্লেখ করা উচিত। এর ফলে আমরা অনুধাবন করতে পারবো, তাঁর সমকালীন লোক তাঁর সম্পর্কে কি চিন্তা করতো এবং কিভাবেই বা তাঁকে মূল্যায়ন করতো।
 
মুহাম্মদ-এর জীবনের একটা অংশের ঘটনাবলীকে ইতিহাস হিসেবে গ্রহণ করে বাকি অংশকে অলৌকিক ঘটনা হিসেবে আপনারা প্রত্যাখ্যান করবেন কেন?
 
আপনারা বলবেন, ওই বিষয়গুলোকে বিশ্বাস করা যায় না। কারণ বর্তমান বৈজ্ঞানিক আইনের সাথে ওই বিষয়গুলোর কোনো মিল নেই - বিজ্ঞানের ওই সব আইনের মূল ভিত্তিই অবশ্য সন্দেহপূর্ণ।
 
কুমারী মাতা থেকে যীশুখ্রিস্টের জন্ম বা তাঁর হাতের ছোঁয়ায় কুষ্ঠ রোগের নিরাময় বা পানির ওপর দিয়ে তাঁর হেঁটে যাওয়া কি অবিশ্বাসযোগ্য নয়? মূসা, জরোয়াস্টার ও বুদ্ধের কাহিনী কি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি অবিশ্বাসযোগ্য নয়? কিন্তু তাঁদের জীবনের সাধারণ কার্যাবলীর চেয়ে ওই সব বিষয় কি আমাদেরকে অপেক্ষাকৃত কম শিক্ষা দেয়?
 
কোনো ইতিহাস লেখার সময় আপনাকে কল্পনা করতে হবে আপনি ওই যুগে, ওই লোকদের মধ্যে অবস্থান করছেন। আপনাকে মনে করতে হবে, আপনি ওই সময়কার লোকদের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক আচরণ ও আবেগের মধ্যে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত আছেন। শুধু কল্পনা নয়, ওই স্থান ও পরিবেশে আপনাকে উপস্থাপন করতে হবে। তারপর আপনি ওই লোকদেরকে দেখুন, তাদের রীতি-নীতি, চিন্তাধারা, লৌকিক কাহিনী, তাদের সামাজিক দোষ-ত্র“টি ও দুর্বলতার মূল্যায়ন করুন। তাদের কুসংস্কার, তাদের কবিতা, তাদের বিশ্বাস, কল্পনা, তাদের যুক্তির পদ্ধতি, দেশে-বিদেশে তাদের পারিবারিক ও মরুভূমির জীবন, এমনকি তাদের ভবিষ্যদ্বাণী করার প্রবণতা এবং তাদের ওপর এর ভালো ও মন্দ প্রভাবও মূল্যায়ন করুন। তারপর তাদের কাছে প্রচারিত তাদেরই ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের আহ্বান ও সতর্কবাণী আপনি শুনুন এবং তারপরই আপনি লেখা শুরু করুন এবং ওই যুগ ও পরিবেশকে আপনার সাধ্যমতো পুনরায় সৃষ্টি করুন।
 
এতদসত্ত্বেও আমি মনে করি, নবীর সাথে অলৌকিক ঘটনা জড়িত থাকলেও, যার অনেকগুলো আমরা পূর্বে উল্লিখিত বিভিন্ন কারণের জন্য লিপিবদ্ধ করেছি, আল্লাহ পবিত্র কুরআনে তাঁর নবী সম্পর্কে যে কথা তাঁর নবীর মুখ দিয়ে প্রকাশ করেছেন তা উল্লেখ করা উচিত : ‘বলুন! আমি তোমাদের মতোই একজন মানুষ। আমার প্রভু আমার প্রতি প্রত্যাদেশ করেন যে, তোমাদের তো মাত্র এক আল্লাহ। এবং যে তার প্রভুর সাথে সাক্ষাৎ কামনা করে সে যেনো সৎকর্ম করে এবং তার প্রভুর ইবাদতে অন্য কাউকে শরীক না করে।’ কুরআন- ১৮ : ১১০
 
মুহাম্মদ ছিলেন সত্যবাদী, সত্যের অনুরাগী এবং তিনি যা ছিলেন ঠিক সে কথাই বলেন। পবিত্র কুরআনের ছেষট্টিটি আয়াতে তিনি সাধারণভাবে প্রত্যাদেশ ও ওহীর কথা বলেন। তিনি বার বার এ সত্য প্রকাশ করে ঘোষণা করেন যে, তাঁর কাছে আল্লাহর ধনভাণ্ডার নেই, তিনি কোনো গোপন বিষয় জানেন না বা তিনি ফেরেশতা বলেও দাবি করেন না। ‘আমি শুধু সেই ওহীর অনুসরণ করি যা আমার ওপর নাযিল হয়।’ - কুরআন - ৬ : ৫০
 
নবীর অতুলনীয় কাজ সম্পর্কে তাঁর সমকালীন লোক ও সেই সময়ের তাঁর অনুসারীগণ অনেক কথাই বলেন। আমাদের মতে, সেসব কথা সেই সময়কার প্রেক্ষাপটের আলোকে উল্লেখ করা প্রয়োজন। অধ্যায় ও বিষয়ের ধারাবাহিকতায় আমরা হয়তো সব কথা বলতে পারবো না, সব কথার সামান্য অংশ কেবল লিপিবদ্ধ করবো। কিন্তু সেসব কথার সবটাই আমরা বলেছি, একথা মনে করে নেবো। এসব বিষয় তৎকালীন আরববাসী ও তার প্রতিবেশীদের চিন্তাধারাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। মুসলিম বিশ্বাসে তাদেরকে আকর্ষণ করার ক্ষেত্রে তা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়।
 
নৈতিক এসব গুণসহ ব্যক্তি মুহাম্মদ, তাঁর ওপর নাযিলকৃত কুরআন ও অন্য সব সাহিত্যের চেয়ে বেশি এর বাগ্মিতা এবং তাঁর ব্যক্তিগত আচরণ - এ তিনটি বিষয় হলো তাঁর যুগের সবচেয়ে বেশি অলৌকিক ঘটনা। একটা কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন এবং তা হলো তাঁর কথার প্রভাব। মুহাম্মদ যখন কথা বলার জন্য মুখ খুলতেন তখন তাঁর কণ্ঠস্বর, প্রকাশের আন্তরিকতা ও কথায় এমন একটা আবহ সৃষ্টি হতো যে, তাঁর কথা শ্রোতাদের অন্তরে গভীরভাবে প্রবেশ করতো। তিনি যখন তাদের কাছে বেহেশতের কথা বলতেন তখন তিনি প্রবাহিত পানির ধারা ও শীতল ছায়াসহ বেহেশতের কথা তাদের স্মরণ করিয়ে দিতেন; তিনি যখন স্বর্গীয় আলোর কথা বলতেন তখন তারা সত্যিকারভাবে দেখতে পেতো, স্বর্গ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত সাদা একটা আলোক-রেখা জ্বলজ্বল করছে। পবিত্র কুরআনেরও প্রভাব ও ফল ছিলো একই রকম। পবিত্র কুরআনের আয়াতগুলো লক্ষ লক্ষ অনুসারীর হৃদয়কে আকৃষ্ট করে।
 
তাঁর কথার এ ফলপ্রসূতা নির্ভরশীল ছিলো অংশত তাঁর চেতনা, অংশত তাঁর যুক্তি এবং অংশত তাঁর মৌলিক আন্তরিকতা ও সত্যবাদিতার ওপর।
 
দৃষ্টান্ত হিসেবে এ ঘটনাটির কথা উল্লেখ করা হলো ঃ
 
একদিন নবী তাঁর কয়েকজন অনুসারীসহ মসজিদে বসেছিলেন। এ সময় একজন আরববাসী সেখানে উপস্থিত হলো। সে তার উটকে ‘হাটুগেড়া’ করলো, উটের পা বেঁধে রাখলো এবং অতঃপর মুহাম্মদ-এর চারপাশে বসা লোকদের কাছে এসে বসলো।
 
সে জিজ্ঞাসা করলো ঃ ‘তোমাদের মধ্যে মুহাম্মদ কে?’
একজন লোক নবীর দিকে তাকিয়ে বললো ঃ ‘আরববাসীর পাশের লোকটিই মুহাম্মদ।’
 
ওই বেদুঈন লোকটি তখন চিৎকার করে বললো ঃ ‘হে আবদুল মুত্তালিবের পুত্র!’
 
মুহাম্মদ জিজ্ঞাসা করলেন ঃ ‘তুমি কী চাও?’
 
ওই আরববাসী জবাব দিলো ঃ ‘আপনার কাছে আমার একটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার আছে।’
 
‘তোমার প্রশ্ন কী বলো।’
 
‘আমার কথার জবাব দিন সত্যিকারভাবে। মানবজাতি ও আমাদের পূর্ব-পুরুষদের প্রভুর শপথ, আল্লাহ কী সত্যি আপনাকে মানুষের কাছে পাঠিয়েছেন?’
 
মুহাম্মদ উত্তর দিলেন ঃ ‘হ্যাঁ, আল্লাহ জানেন।’
 
আরববাসী বললো ঃ ‘আল্লাহর নামে শপথ করে আমাকে সত্য জবাব দিন। আল্লাহ কী আপনাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমাদের প্রত্যেক দিন ও রাতে পাঁচবার নামায পড়তে হবে?’
 
‘হ্যাঁ, আল্লাহ জানেন।’
 
‘আল্লাহর নামে আমাকে সত্য জবাব দিন। আল্লাহ কী আপনাকে ধনীদের কাছ থেকে দান গ্রহণ করে তা গরীবদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন?’
 
‘হ্যাঁ, আল্লাহ জানেন।’
 
‘মুহাম্মদ, আপনি শুনুন!’ বেদুইন ওই লোকটি বললো, ‘আমি একা নই। আমার সাথে রয়েছে আমার জনগণ ও আমার গোত্রের লোকেরা। আমরা সবাই আপনার সাথে যোগ দিলাম এবং আপনার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করলাম।’
 
সাধারণ ওই আলোচনা এবং মুহাম্মদের বলা তিনটি ক্ষুদ্র কথার মধ্যে এমন কী ছিলো যা ওই আরববাসীর মনকে জয় করে?
 
তাঁর কথায় এমনকি ছিলো যার জন্য ওই আরববাসীর মতো বা তার চেয়ে অধিক জ্ঞানী হাজার হাজার লোক এক আল্লাহর ইবাদতে অনুগত হয়, তাদের নীতিহীন প্রথা পরিত্যাগ করে এবং তাদের সম্পদ গরীবদের মধ্যে বিলিয়ে দেয়?
 
কথার প্রভাব বলতে আমরা এ কথাই বলতে চেয়েছিলাম।
 
এ পুস্তকখানি তিন অংশে বিভক্ত ঃ
 
  • ১. নবীর জন্মের পূর্ব থেকে তাঁর মিশন শুরু হওয়া পর্যন্ত।
  • ২. মিশন শুরু হওয়া থেকে হিজরত পর্যন্ত, এবং
  • ৩. হিজরত থেকে মৃত্যু পর্যন্ত।
এছাড়া পুস্তকের শুরুতে আমরা দু’টো ‘দৃশ্যপট’ অন্তর্ভুক্ত করা যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেছি। তৎকালীন বিশ্বের অবস্থা ওই দুই ‘দৃশ্যপটে’ বর্ণনা করা হয়েছে। ওই দু’টি ‘দৃশ্যপটে’র পর পরই জমজম কূপ খননের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে, ওই দুটো দৃশ্যপটে’র ঘটনা জমজম কূপ খননের ঘটনার আগের সময়কার। ওই দু’টো ‘দৃশ্যপটে’র ঘটনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে দু’টো মহান সাম্রাজ্যের মানুষের জীবনকে শুধুমাত্র নমুনা হিসেবে দেখাবার জন্য। ওই সময় পারস্য ও রোম ছিলো সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী এবং সভ্যতার দিক থেকে শ্রেষ্ঠ জাতি। প্রত্যেকের নিজস্ব রীতি-নীতি ছিলো, আইন ছিলো এবং ছিলো প্রতিষ্ঠানগত বিধি-বিধান। বাহ্যিক দিক থেকে এসব বিধি-বিধান ছিলো অত্যন্ত নিখুঁত এবং পূর্ণাঙ্গ। অথচ হেজাযের আরববাসীরা অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক দিক থেকে বসাবস করতো অজ্ঞতা ও দরিদ্রতার অতল গহ্বরে; তারা নিমজ্জিত ছিলো অশ্লীল ও নীতিহীন কর্ম প্রবাহে। মুহাম্মদের মিশন সফল করা যে কতোটা কষ্টকর ছিলো তা ওই বিপরীত দুই পরিবেশ থেকে পাঠকরা উপলব্ধি করতে পারবেন - এ দুই পরিবেশের একদিকে ছিলো অজ্ঞ জনগণ এবং অপরদিকে ছিলো সভ্য ও শক্তিশালী দুই সাম্রাজ্য। বিশ্বের মধ্যে ছোট্ট একটা শহর থেকে পবিত্র কুরআনের মহান বাণী মুহাম্মদের কণ্ঠস্বরে বিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছে গেলো এবং দৃষ্টান্তহীন দ্রুতগতিতে সর্বত্র তাঁর অনুসারীদের মন জয় করলো, এ বিষয়টাও পাঠকদের দৃষ্টিতে আসবে।
 
হেজাযের এ আরববাসীরা বিশ্ব জয় করেনি। মুহাম্মদের মতবাদের মৌলিক আদর্শই ওই জয় সম্ভব করে এবং আজ পর্যন্ত ওই আদর্শ সজীব রয়েছে।
 
সবশেষে সব পণ্ডিত ব্যক্তিকে অনুরোধ জানাই, যদি এ পুস্তকের কোথাও কোনো ভুল লক্ষ্য করেন তা হলে দয়া করে তাঁরা যেনো তা আমাকে জানান। ফলে, পরবর্তী সংস্করণে সেই ভুল সঠিক করে দেওয়া হবে। কারণ, মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা হলো ভুল করা এবং ভুলে যাওয়া।
 
যায়নুল আবেদীন রাহনুমা
বৈরুত
২৩ জুন ১৯৩৭
 
 

লেখকের নিবেদন

দ্বিতীয় খণ্ড

ষোল বছর হলো ‘পয়াম্বর’-এর প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে অনেক পাঠক অনুগ্রহ করে আমাকে এর দ্বিতীয় খণ্ড ও তৃতীয় খণ্ড শেষ করতে বলেন। কিন্তু মাঝে মাঝে সংগৃহীত ‘নোট’-এর ওপর চোখ বুলালেও প্রথম খণ্ডের লেখার সেই মনোরম ভঙ্গির সঙ্গে তুলনা করা যায় - এমন রচনার প্রস্তুতির পর্যায়ে আমি আসতে পারিনি। এ সমস্যার কথা আমি আমার কতিপয় সাহিত্যিক বন্ধুর কাছে বলি। তাঁরা এ ব্যাপারে প্রায়ই আমাকে উৎসাহ দিতেন। এমনকি তাঁরা আমার সংগৃহীত ‘নোট’ তাঁদের কাছে হস্তান্তর করারও প্রস্তাব দেন, যেনো তাঁরা দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ডের লেখা সমাপ্ত করতে পারেন। কিন্তু অনেক বই আছে যা কেবল চেষ্টার দ্বারাই লেখা সম্ভব হয় না। এ ধরনের গ্রন্থ রচনায় চেষ্টা ও কাজের চেয়ে বেশি দরকার হয় মেজাজ ও প্রেরণার। আমাদের মন, হৃদয় ও চিন্তার মধ্যে অনুভবগম্য যে উপাদান আছে, গ্রন্থ রচনার মৌল অংশটুকু তারই অবদান বলা চলে। বস্তুত তিনিই সত্যিকার লেখক। আর আমরা শুধুমাত্র সেই গোপন বস্তুর মেধাবী বা অ-মেধাবী কেরানী হিসেবে চিহ্নিত হই। সেই গোপন বস্তু দেখা যায় না ঠিকই, তবু তা আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের অনুভব ও চিন্তার মধ্যে বর্তমান থাকে। এ গোপন বস্তুর নাম ওহী অথবা অনুপ্রেরণা, আবার কখনো বা তা ভালোবাসা বা মোহান্ধতা হিসেবে চিহ্নিত হয়। তাই আমি আমার সংগৃহীত নোটগুলোর দিকে বিষণœ ও হতাশার দৃষ্টিতে তাকাই। এ নোটগুলো আমি অনেক পরিশ্রম করে বিভিন্ন পাঠাগার থেকে জোগাড় করেছি - জোগাড় করেছি বৈরুতের ‘আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার’ থেকে, ভারতের হায়দ্রাবাদের ‘মরহুম স্যার সালার জঙ্গের গ্রন্থাগার’ থেকে, নিউইয়র্ক ও প্যারিস মহানগরীর জাতীয় গ্রন্থাগারগুলো থেকে। এর মধ্যে ষোলটি বছর কেটে গেছে। সূর্য ও তরঙ্গের আঘাতে সাগর তীরের দৃঢ়ীভূত ও শিলীভূত মহাপর্বতের মতো আমার মন যেনো স্থবির ও পাষাণে পরিণত হয়েছে।
 
বর্ষপরিক্রমায় গত বছর রমযান মাস ফিরে এলো। এ মাসটিকে আমি বড় ভালোবাসি, এ মাসেই মানবজাতির একটা বিরাট অংশ গোপন প্রার্থনায় রত হয়। লক্ষ লক্ষ মানুষ অন্তত তাদের চিন্তা ও হৃদয়ে বেহেশতের পথ অনুসরণ করে এবং সূর্যাস্তকালে তারা লক্ষ্য করে তাদের আশা ও স্বপ্ন অথবা বেশি করে বললে বলতে হয়, প্রত্যুষে যখন তারা প্রভাতী তারা অবলোকন করে, তখন তাদের আশা ও স্বপ্ন যেনো কোনো এক অদৃশ্য পরম সত্তার কাছ থেকে বিচ্ছুরিত উপঢৌকনের মতো তাদের ওপর ঝরে পড়ে। এ সেই আশা, যা তাদের নামহীন অব্যক্ত তৃষ্ণাকে করে অপনোদন। অগণিত মানুষ যারা তাদের নিগৃহীত ও যন্ত্রণাদগ্ধ জীবনে মানুষের গড়া এ নিয়ম-কানুন নিয়ন্ত্রিত সমাজে কোনো মুক্তির সন্ধান পায় না - দুর্ভাগ্য ও পীড়নক্লিষ্ট মূহুর্তে তাদের আঁখি থেকে যে অশ্র“ নির্গত হয়, সেই উজ্জ্বল অশ্র“র যেনো কোনো শেষ নেই। এমনকি প্রতিটি দিনাবসান তাদের জন্যে কোনো সান্ত্বনা বয়ে নিয়ে আসে না। সুকঠিন শ্রম আর বেদনায় পূর্ণ সেই দিনগুলোতে যে সামান্য পারিশ্রমিক তারা পায়, তা দিয়ে তাদের পরিবারস্থ লোকদের তীব্র দৈহিক ক্ষুধার দাবিটুকুও মেটানো সম্ভব হয় না। তাই যখন তারা তাদের ছিন্ন শয্যায় শুয়ে অন্যের সুখের সাথে তাদের দুঃখের তুলনা করে, তখন তারা তাদের অন্তরের অন্তস্থলে সামাজিক অবিচার ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায় না। তবু তারা সীমাহীন স্বর্গের পথ অনুসরণ করে এবং তাদের ধর্মের শ্রেষ্ঠ ও মহান নেতাদের কথা ও বক্তৃতায় আগামীর শুভদিনের আশ্বাস লাভ করে।
 
গত বছর ১৮ রমযানের প্রাক্কালে তথা মধ্যরাতের কিছু পরে আল্লাহর কাছে বিনীতভাবে প্রার্থনারত জনৈক ব্যক্তির হৃদয়ের গোপন কথার রোমাঞ্চকর অনুরণন ধ্বনিতে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। কবিতায় পারস্যের জ্ঞানভাণ্ডার ও স্মৃতিশাস্ত্রের সান্ত্বনাদায়ক কথা তারকারাজির চেয়েও উজ্জ্বল। প্রার্থনারও ব্যক্তির কথার অনুরণন ধ্বনিতে আমি হতবুদ্ধি হয়ে পড়লাম - আমার হৃদয় হলো আলোকিত। ঘুম থেকে উঠে আমি পাশের ঘরে গেলাম। সেখানে আমি পুণ্যাত্মা ও শান্তিপূর্ণ মনের অধিকারী আল্লাহর কতিপয় বান্দাকে দেখতে পেলাম। ফজরের নামায পর্যন্ত আমি তাদের সাথে কাটালাম। তারপর আমি পড়ার ঘরে গিয়ে বসন্তকালের সেই উষ্ণ সকালে কয়েক ঘণ্টা ধরে লিখলাম। আর সৃষ্টি হলো এ পুস্তকের দ্বিতীয় খণ্ডের প্রথম অধ্যায়। ছয় মাস পরে আমি এ পুস্তকের শেষ অধ্যায় সমাপ্ত করলাম।
 
প্রথম খণ্ডের মতো এ খণ্ডটি লেখার জন্য আমি একশ’র বেশি নির্ভরযোগ্য পুস্তকের সাহায্য নিয়েছি। দু’খানি বই-এর ওপর আমি বেশি নির্ভর করেছি। বই দু’খানি হলো - ইবনে হিশাম-এর ‘সীরা’ এবং ‘সীরা আল-হালাবিয়া’। এ বই দু’খানিই ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য বই বলে বিবেচিত হয়ে থাকে।
 
সবশেষে, এই বইয়ের মধ্যে পাঠকগণ যদি কোনো ভুল লক্ষ্য করেন, তবে তাঁদেরকে তা আমাকে জানানোর অনুরোধ করছি। এ কাজ করে তাঁরা আমাকে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করতে পারেন।
 
যায়নুল আবেদীন রাহনুমা
জেনেভা
জুন ১৯৫৩
 

লেখকের নিবেদন

তৃতীয় খণ্ড

আমি অত্যন্ত সুখ ও শান্তির সাথে আজ একথা লিখছি যে, অবশেষে আমি পাঠকদের কাছে ‘পয়াম্বর’ গ্রন্থের তৃতীয় খণ্ড তুলে দিতে সক্ষম হলাম। অনেক বছর আগে আমি যে কাজ শুরু করেছিলাম, তা-ও আজ সমাপ্ত হলো।
 
এ কাজটা ছিলো খুবই কঠিন। তবু এ কাজ সম্পাদন করে আমি খুবই আনন্দিত হয়েছি। আমি আমার সাহিত্যিক জীবনে যতো কিছু লিখেছি তার মধ্যে এ কাজটাই স্মরণীয় হয়ে থাকুক, এটাই আমার ঐকান্তিক প্রত্যাশা। এ পুস্তকখানি আমি ইসলামী বিশ্বাসের স্বর্গীয় আলোয় উদ্বুদ্ধ হয়ে লিখি। ওই আলো কোনোদিন নির্বাপিত হবে না।
 
প্রত্যাশিত সময়ের আগেই আমি তৃতীয় খণ্ড লেখার কাজ সমাপ্ত করি। এ জন্য আমি তেহরানের জাতীয় গ্রন্থাগারের প্রতিষ্ঠাতা মহান সদাশয় ব্যক্তি জনাব মালেককে ধন্যবাদ জানাই। এ গ্রন্থাগার ও চেনারান-এ জনহিতকর ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার জন্য আমি এ গ্রন্থখানি তাঁর নামেই উৎসর্গ করলাম।
 
যায়নুল আবেদীন রাহনুমা
প্যারিস
ফেব্র“য়ারি ১৯৫৬
 
 
 
 
 

Specifications

  • বইয়ের লেখক: যায়নুল আবেদীন রাহনুমা
  • আই.এস.বি.এন: ৯৮৪-+++++++++++++++
  • স্টকের অবস্থা: স্টক আছে
  • ছাড়কৃত মূল্য: ৪৫০.০০ টাকা
  • বইয়ের মূল্য: ৬০০.০০ টাকা
  • সংস্করণ: প্রথম হাক্কানী সংস্করণ
  • প্রকাশক: হাক্কানী পাবলিশার্স
  • মুদ্রণ / ছাপা: হাক্কানী প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং
  • বাঁধাই: Hardback
  • বছর / সন: সেপ্টেম্বর, ২০০৮

Share this Book

Sky Poker review bettingy.com/sky-poker read at bettingy.com